আমাদের তারাবী
অনেকেই জানেন না যে আমার কুরআন
পুরোটা মুখস্থ।
তারাবীর নামাযের মজা আমার পেতে
হয়েছে দু’রকম ভাবে। হয় নামাযের নাম করে ঘুরে বেড়িয়ে। অথবা নিজে নামাজ পড়ানোর
ফান্দে পড়ে। দুটোরই আলাদ মজা। যখন আমি প্রথম তারাবীর নামায পড়ানোর জন্য ইমাম
হিসেবে দাঁড়াই তখন আমার বয়স ১৩-১৪ হবে। বুক দুরপুর করছে। সে কি অনুভূতি!
যদি কোনভাবে নির্ধারিত দিনের
অংশটা ঠিকঠাক পড়া না হতো তবে নামাযের ভেতর মন বসতো কিনা তা নিয়ে আমার বিশদ সন্দেহ।
মিথ্যে বলবোনা, পরের রাকাতে যেই পৃষ্ঠা পড়া হবে তা অনেক সময় রুকু-সেজদাতে গিয়েও
পড়েছি। আর সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত হলো কোন আয়াতের কোন অংশ বাদ পরে যাওয়া। ভাইরে ভাই
সেটা রেলগাড়ির অচেনা রাস্তার মত। এক আয়াত থেকে অন্য আয়াতে কিভাবে আপনি হারিয়ে
যাবেন নিজেই বুঝবেন না।
তবে যখন হাফেজ হইনি তখনও আমি
নিয়মিত তারাবী পড়তাম। ছোটবেলা থেকেই। এটা ছিলো বড় ভুল। নামাযের নাম করে বাইরে ঘুরে
বেড়ানোর সুযোগ পেতাম না। কারণ অলরেডি মসজিদের সবাই চিনে ফেলেছে। এক বোতল পানি নিয়ে
আর অন্য হাতে জায়নামায বগলদাবা করে মসজিদে ছুটতাম। টাকা থাকলে হালিম আর বট ভাজা
খেতাম আসার সময়। আমাদের বাড়িওয়ালা আমার নামায পড়বার ব্যাপারটা হেব্বি পছন্দ
করেছিলেন। তাই তিনি বেশ কয়েকদিন ফিরবার পথে আমাকে চিপস কিনে দিয়েছিলেন। বিশ্বাস
করেন, এরপর আমি বহুদিন তারাবীর নামায পড়তে গিয়েছি এজন্য যে, ফিরবার পথে সে আমাকে
চিপস কিনে দেবেন।
তারপর হঠাৎ একদিন আমি মাদ্রাসা
থেকে বাসায় ফিরলাম। বাড়িওয়ালা (তাকে নানা বলে সম্বোধন করতাম) সে ছুটে এলো। আমাকে
অবাক ও বিস্ময়ের চোখে জিজ্ঞেস করলো, তুমি নাকি পুরা কুরআন মুখস্থ করে ফেলসো? আমি
মুচকি হেসে বললাম, জ্বী নানা তা করেছি বটে। তিনি অবাক হবার দৃষ্টি আরো প্রসারিত
করে বললেন, তার মানে তুমি মুখস্থ কোরআন খতম দিসো? আমি বললাম, আমি তো দুই খতম
মুখস্থ শুনিয়েই আসলাম। তিনি অবাক দৃষ্টিতে হাঁ হয়ে রইলেন। তাকে আর বলা হয়নি আমি
পাঁচ খতম মুখস্থ শুনিয়েছিলাম। তারপর উনি মাঝেমধ্যেই বাচ্চাদের মত প্রশ্ন করতেন।
যেমন একদিন জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি পড়ার সময় যে টান দেয় বা গুন্নাহ করে তাও মুখস্থ
জানি কিনা। আমি বললাম জানি। বা জিজ্ঞেস করতেন নামাযে দাঁড়িয়ে মুখস্থ যখন পড়ি তখন
চোখের সামনে কী আসে? আমি বললাম, কুরআনের পাতাগুলো হুবুহু ভাসে। তার অবাক হওয়া
থামেনা।
তারপর আস্তে আস্তে দুনিয়ার কত্ত
পড়াশোনায় মন দিলাম। মাদ্রাসা পেরিয়ে এখন উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি।
কিন্তু তাও রাতের বেলা হঠাৎ হঠাৎ মনে হয় আমার ছোট্টবেলার কোমল বুকে ধারণ করেছিলাম
উচ্চশিক্ষার মসনদ।
যাইহোক এবারই প্রথম আমি না
তারাবীর নামায পড়াচ্ছি, না মসজিদে তারাবীর নামায পড়ছি, না নামায পড়ার নাম করে
ঘুরছি। ঘরে বসে বিশ রাকাত তারাবী পড়ার ইচ্ছে নিয়ে কখনই জন্মাইনি।
ও হ্যাঁ, কিছুদিন আগে সেই আমার
ছোট্ট বাড়িওয়ালা নানা বরিশালের একটা চিলেকোঠায় টুপ করে মরে গেলেন। তিনি আমাকে বই
পড়া শিখিয়েছিলেন। বলেছিলেন আমি বড় হলে আমাকে একটা বিশাল বই রাখার ঘর দেবেন ফ্রি
তে। আমি তার মৃত্যুর খবর বাবার থেকে জানলাম। এবং একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। আমার
ঘরভর্তি বইয়ের খবর সে জানলোই না। আফসোস!


0 comments:
Post a Comment